তবে গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সব কারখানায় ঈদ বোনাস পরিশোধ হয়নি। শিল্প পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আট শিল্প এলাকার মোট ১০ হাজার ২৩৮ কারখানার মধ্যে গতকাল বিকাল পর্যন্ত এপ্রিলের বেতন পরিশোধ করেছে ১০ হাজার ৭৬টি। বেতন বকেয়া ছিল ১৬২টি বা ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ কারখানায়। বাকি ৯৮ দশমিক ৪২ শতাংশ কারখানায় বেতন পরিশোধ হয়েছে। অন্যদিকে ঈদ বোনাস পরিশোধ হয়েছে ৮ হাজার ৭৩৮ কারখানায়। গতকাল বিকাল পর্যন্ত বোনাস বকেয়া ছিল ১ হাজার ৫০০ কারখানায়। এ হিসাবে ১৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ কারখানায় ঈদ বোনাস পরিশোধ হয়নি।
তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ এবং বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) আওতাধীন মোট ৩ হাজার ২৭০ কারখানার মধ্যে এপ্রিলের বেতন বকেয়া রয়েছে ৯২টিতে। এসব সংগঠনের সদস্য কারখানার ২ দশমিক ৮১ শতাংশে এপ্রিলের বেতন পরিশোধ হয়নি। অন্যদিকে একই সংগঠনগুলোর ৪০৯ কারখানায় এখনো ঈদ বোনাস পরিশোধ হয়নি, যা মোট সদস্য কারখানার ১২ দশমিক ৫১ শতাংশ।
গতকাল সন্ধ্যায় বেতন-বোনাস পরিশোধকে ঘিরে শ্রম পরিস্থিতির সর্বশেষ বাস্তব চিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উদ্ভূত সমস্যাগুলো সরকার, শিল্প পুলিশ ও মালিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত তৎপরতায় দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। এক্ষেত্রে শ্রমমন্ত্রী ও শ্রম সচিব সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রেখেছেন এবং বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গেও নিয়মিত সমন্বয় করা হয়েছে। যেসব কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ নিয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে, সেগুলো বসে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। কিছু কারখানায় বোনাস বকেয়া থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা আজকের মধ্যেই পরিশোধ হয়ে যাবে।
গতকাল সন্ধ্যায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পরিস্থিতি সব মিলিয়ে মোটামুটি ভালোই। টুকটাক কিছু সমস্যা তো থাকেই। শ্রমমন্ত্রী, শ্রম সচিব সবাই সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। আমরা বিজিএমইএ, বিকেএমইএ নেতাদের সঙ্গেও সমন্বয় করছি। যেখানেই সমস্যা হচ্ছে, বসে সমাধানের চেষ্টা করছি। যেটুকু বাকি আছে, বিশেষ করে বোনাসের বিষয়টি, বেশির ভাগই আজকের মধ্যেই হয়ে যাবে।’
দুই-একটা ফ্যাক্টরিতে ঝামেলা হচ্ছে উল্লেখ করে উদাহরণ দিয়ে গাজী জসীম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেমন আশুলিয়ায় আলিফ গার্মেন্টস নিয়ে কিছু সমস্যা ছিল। আবার এনার্জিপ্যাকেও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, শ্রমিকরা সড়কের দিকে চলে আসছিল। আমরা বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছি। পরে তারা বেতন-বোনাস পরিশোধ করেছে। নারায়ণগঞ্জে বি ব্রাদার্স নামে একটি কারখানা নিয়েও কিছু সমস্যা হচ্ছে। সেটিও সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা করছি।’
অতিরিক্ত আইজিপি আরো বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে আমাদের এমন কিছু কাজ করতে হচ্ছে, যেগুলো আসলে আমরা করতে চাই না। মালিক পক্ষকে ডেকে কিছুটা চাপ দিতে হচ্ছে। তা না হলে হচ্ছে না। সবকিছু মিলিয়ে আমরা মনে করছি, এবারেও গত ঈদের মতো পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এবং শ্রমিকরা বেতন-ভাতা নিয়েই বাড়ি যাচ্ছেন, দুই-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া।’
শিল্পাঞ্চলগুলোতে ঈদ-পূর্ব শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে গত ১৪ মে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) ৯৫তম এবং আরএমজি-বিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের ২৪তম সভায় শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ২১ মের মধ্যে শ্রমিকদের ঈদ বোনাস এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাসিক বেতন পরিশোধের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘সময়মতো বেতন ও বোনাস পরিশোধ করা হলে শিল্পাঞ্চলে কোনো ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হবে না। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, জেলা পুলিশ ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেয়া হয়।’
পরে ২০ মে শিল্প পুলিশ সদর দপ্তরে এক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে ঈদের ছুটি শুরুর আগেই শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধে ব্যবসায়ী নেতাদের আহ্বান জানানো হয়। সভায় আরো জানানো হয় যে কিছুসংখ্যক কারখানা বেতন-বোনাস পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে। এ অবস্থায় শ্রমিকরা যেন সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে জনভোগান্তি সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের ইউনিট-প্রধানদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকেও সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শিল্প অধ্যুষিত আট এলাকার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে এখনো সবচেয়ে বেশি কারখানায় ঈদ বোনাস বকেয়া রয়েছে। এ অঞ্চলের মোট ১ হাজার ৯৬০ কারখানার মধ্যে বোনাস পরিশোধ হয়নি ৭৭১টিতে। অর্থাৎ প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ কারখানায় এখনো বোনাস বকেয়া রয়েছে। অন্যদিকে সিলেট অঞ্চলের পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। মোট ৭৪৮ কারখানার মধ্যে বোনাস বকেয়া রয়েছে মাত্র ২৮টিতে। এ অঞ্চলে ৯৬ দশমিক ২৬ শতাংশ কারখানায় বোনাস পরিশোধ সম্পন্ন হয়েছে।
সংগঠনভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, বিজিএমইএর শিল্প পুলিশের আওতাধীন সদস্য ১ হাজার ৭৯০ কারখানার মধ্যে এপ্রিলের বেতন বকেয়া রয়েছে ৪৭টিতে এবং ঈদ বোনাস বকেয়া রয়েছে ২২০ কারখানায়। বিকেএমইএর সদস্য ৭০৮ কারখানার মধ্যে এপ্রিলের বেতন বকেয়া ২৮টিতে এবং বোনাস বকেয়া ১২৬ কারখানায়। বিটিএমএর সদস্য ৩৮২ কারখানার মধ্যে এপ্রিলের বেতন বকেয়া রয়েছে ১৫টিতে এবং বোনাস বকেয়া রয়েছে ৫৭ কারখানায়। অন্যদিকে বেপজার আওতাধীন ৩৯০ কারখানার মধ্যে এপ্রিলের বেতন বকেয়া রয়েছে দুটিতে এবং ঈদ বোনাস বকেয়া রয়েছে ছয় কারখানায়।
এদিকে পাটকল খাতে মোট ৭৬ কারখানার মধ্যে এপ্রিলের বেতন বকেয়া রয়েছে একটিতে এবং ঈদ বোনাস বকেয়া রয়েছে ছয় কারখানায়। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠনের বাইরে থাকা অন্যান্য ৬ হাজার ৮৯২ কারখানার মধ্যে এপ্রিলের বেতন বকেয়া রয়েছে ৬৯টিতে এবং বোনাস বকেয়া রয়েছে ১ হাজার ৮৫ কারখানায়।
বিজিএমইএ-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রামে সংগঠনটির সদস্য সক্রিয় পোশাক কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ১৩৪। এর মধ্যে প্রায় সব কারখানাই এপ্রিলের বেতন পরিশোধ করেছে। বোনাস পরিশোধ করেছে ২ হাজার ৫৯ বা ৯৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ কারখানা। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কারখানা মে মাসের বেতনও অগ্রিম পরিশোধ করেছে বলে দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।